নৈঃশব্দের তোমার পদধ্বনি

By admin Mar 25, 2023

লেখনীতে : “মুসকান হিম্রাদিতা” –September 25, 2021 Published at JARLIMITED.COM

মূল অংশ::::
পাঠ – ১

প্রকান্ড ঘরে দাঁড়িয়ে আছে ইহসান।পুরো ঘরে আবছা হলুদ রঙের আলো ছড়িয়ে রয়েছে।কোথাও বেশি বা কম নেই, সব সমান।সেই ঘর থেকে হালকা চন্দন আর গোলাপজল এর ঘ্রান বের হচ্ছে।বিশাল জানালা দুটো পর্দা দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়েছে।ইহসানের হাতে সোনালি কারুকাজ খচিত একটা সুন্দর শাড়ি।দীর্ঘ ৫ মাস ধরে রাত জেগে সে এই শাড়ি নিজের হাতে তৈরী করেছে তার প্রিয় মানুষটির জন্য।একদিন সে নিজের হাতে তাকে এই শাড়ি পরিয়ে দেবে।
ইহসান শাড়ির প্রতিটি কোণায় হাত আলতো করে বুলিয়ে দিচ্ছে।শহরের সেরা ১০ জন ফ্যাশন ডিজাইনারদের মধ্যে ৪ নাম্বার এ অবস্থান তার।কিন্তু তার শাড়ির সম্পকে ধারনা ১ নাম্বার এ।প্রতিটি শাড়ি তিনি একবার দেখেই বলে দিতে পারে সেই শাড়ির কোথায় খুত রয়েছে আর সে শাড়ি কত দিন টিকবে।
এই ঘরে যে ইহসান একা আছে সেটা বললে মস্ত ভুল হবে।তার সাথে সবসময় যে থাকে ,সে আজকেও তার কর্মকান্ড দেখছে।শাড়ির প্রতিটি কোণা যে সুক্ষ্ম হয়েছে তা বুঝতে পেরে মুচকি হেসে কম্পিউটার এর পাশে থাকা রকিং চেয়ারের দিকে তাকায়।যা ইহসানের উলটো দিকে ঘোরানো রয়েছে।ধীর পায়ে সেই দিকে এগোতে থাকে ইহসান।চেয়ারে কাছে গিয়ে তার হাতলে হাত রেখে চেয়ার টা তার দিকে ঘুরাতে যাবে এমন সময়ই দরজায় টোকা পড়লো।
বাহির থেকেই আওয়াজ এলো- মে অ্যাই কামিং স্যার?
মুখ দিয়ে বিরক্তসূচক একটা আওয়াজ করে চেয়ারে হাতল ছেড়ে শাড়ি রাখা জায়গাটায় এসে দাঁড়িয়ে উত্তর দিলো- ইয়েস,কামিং।

এইঘরটাকে সব সময় ই ভয় পায় মানবিকা।কেমন যেন সবসময় ভিতরে আবছা আলো থাকে।এমনকি সূর্যের আলো ও ঠিক মতো ঢুকে ঘরটাকে আলোকিত করতে পারে না।কেমন ভুতুড়ে পরিবেশ।স্যারের অনুমতি পেয়ে বুকে সাহসের জন্য জোরে একটা নিঃশ্বাস নিয়ে নিলো।যদি ও জানে এতে তার একটু ও সাহস বাড়েনি কিন্তু তা ও ওর দাদি বলেছিলো এইভাবে দম নিলে সাহস বাড়ে।তাই সবসময় এমন ই করে মানবিকা।দরজা খোলার সাথে সাথে প্রত্যেকবারের মতোই কেমিক্যাল এর গন্ধ নাকে এলো মানবিকার।সাথে মাটির একটা নিজস্ব গন্ধ ও রয়েছে।শাড়ির কাপড়ে হয়ত কেমিক্যাল মিশানো হয় তাই এর গন্ধ পাওয়া যায় কিন্তু এই সিমেন্টে তৈরী চারতলা দালানে মাটির গন্ধ কিভাবে আসে সেটা কিছুতেই বুঝতে পারে না।ভিতরে ঢুকে একবার রুমে চোখ বুলিয়ে দেখে নিলো।না সব একই রকম আছে।এই ঘরের কিছুই কখনো পরিবর্তন হয় না।ইহসানের দিকে এগোনোর আগে একবার পাশ ফিরে রকিং চেয়ার টা দেখে নিলো।
-স্যার,এই কোম্পানি চারশ কোটি টাকার ডিল করেছে।আপনি যদি সব কিছু একবার দেখে সাইন করে দেন তবে কাল থেকেই কারখানায় শাড়ি তৈরীর কাজ শুরু করা যাবে।
ফাইল নেওয়ার জন্য বাম হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল- মিস মানবি,আমার মনে হয় আপনি কিছু নিয়ম মেনে চলছেন না।
মানবিকা আর বাকি কথা শুনে না।ইহসানের প্রতি মানবিকা একটু দূর্বল।ইহসান বিবাহিত।সে তার বউকে প্রচন্ড ভালবাসে সেটা জানার পর ও কিছুতেই দূর্বলতা কমাতে পারেনি বরং ইহসান তাকে মানবিকার বদলে মানবি বলে ডাকায় মনের ভিতর প্রজাপতির ডানা ঝাপটায়।ইহসান বয়সে মানবিকার চেয়ে অনেক বড়।মানবিকা ২৫ আর ইহসান প্রায় ৪৫ এর কাছাকাছি। তারপর ও মানবিকার কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর পুরুষ ইহসান।ড্রেস কালেকশনে ও ইহসান সবার সেরা।যখন যখন এই কোম্পানির জন্য মডেলিং করতে হয় তখন এই ইহসান নিজের হাতে মানবিকার সমস্ত শাড়ি,গহনা এমনকি নিজের হাতে সাজিয়েও দেয়।সে জন্য অফিসের বাকিরা মাঝে মাঝে বলে ও বসে – ম্যাডাম যদি সব জানতে পারে তবে এই শাড়ির কোম্পানি ই পুড়িয়ে দিবে।কিন্তু মানবিকা তাদের কিছু বলে না।আসলে বলার মত কিছুই নেই।এমন কখন ও মনে হয় নি যে ইহসান ও তার প্রতি দূর্বল।সব মায়া,সব অনুভুতি একান্তই মানবিকার।
ইহসান নিজের প্রশ্নের উত্তর পায় নি বলে মানবিকার দিকে ফিরে দেখে সে একদৃষ্টিতে তার দিকেই তাকিয়ে আছে।ইহসান হাত দিয়ে একটা তুড়ি বাজাতেই মানবিকার ধ্যানভগ্ন হয়ে গেলো।অপরাধীর মতো ছোটস্বরে আমতা আমতা করে বলল- সরি স্যার।
সেদিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে ইহসান মানবিকার ডান হাত ধরে উপরে তুলে সেই হাতে ফাইল তুলে দিয়ে বলল- কিসের এত চিন্তা মিস মানবি?
এই প্রশ্ন শুনে মানবিকা পিছনে ফিরে কম্পিউটার এর পাশে রকিং চেয়ারের উলটো হয়ে বসে থাকা মানুষটির দিকে তাকায়।মনে মনে বলে – ‘আমি আপনাকে ভীষন হিংসা করি ম্যাম।শুধুমাত্র এইকারনে আমি আপনার প্রতিদ্বন্দ্বী।’
-পিছন ফিরে কি দেখছো?
-সরি স্যার।কিছু না।
-বেশ,এর আগে যেসব প্রশ্ন করেছি তার উত্তর দেও।
আমতা আমতা করে এদিক ওদিক তাকাতে থাকলো মানবিকা।তা দেখে ইহসান দুই হাত প্যান্টের পকেটে গুজে ছোট নিঃশ্বাস নিয়ে শাড়ির কাছে চলে আসে।এসে বলে – নিয়মের সাথে সাথে আপনি মনে হয় মনোযোগ ও হারিয়েছেন।
-সরি স্যার।
-সরি স্যার এটা কি আপনার মুদ্রা দোষ?(বেশ বিরক্ত হয়েই বললো)

  • না মানে শুনতে পাই নি কি বলেছিলেন আপনি সেটা।
    -আমার মনে হয় আপনি কিছু নিয়ম ভুলে যাচ্ছেন বা মনের সাথে যুদ্ধ করে ও খুব একটা লাভ করতে পারছেন না।
    -কেন স্যার? আমার কাজে এ ক……..
  • আপনার মান্থলি ইনকাম কত?
    -এই প্রশ্ন শুনে বেশ অস্বস্তিতে পড়ে মানবিকা। তবু ও মুখে বলে – সিক্সটি ফাইভ থাউজেন্ট।
    -এই পেমেন্ট নিয়ে সব খরচ বাদ দেওয়ার পর ও প্রায় টুয়েন্টি ফাইভ থাউজেন্ট এর মত টাকা বাড়তি থাকে।অথচ একই কোম্পানি তে যারা কাজ করে তোমার থেকে উচুতে থেকে ও তাদের ইনকাম ফিফটি অর সামথিং। কোনো প্রশ্ন জাগে নি কেন এত বেশি টাকা এই কোম্পানি তোমাকে দেয়?
    বেশ অপমানবোধ করতে লাগল মানবিকা।আসলেই তার বেতন সবার থেকে বেশি।অথচ তার কাজ শুধু ডিল হওয়া ফাইলগুলো সাইন করিয়ে নেওয়া।আর ও একটা ব্যাপার আছে, সবার বেতন মাসের প্রথম দিন স্যার নিজের কেবিনে নিজে প্রত্যেকের হাতে তুলে দেয় কিন্তু মানবিকার বেতন সবসময় ব্যাংকের মাধ্যমে পরিশোধ করেন।ব্যাপার টা নিয়ে এতদিন মাথায় কিছু আসে নি কিন্তু আজকে স্যারের মুখে শোনার পর মনে হলো নিশ্চয়ই কোনো কারন আছে।তাই প্রশ্ন করলো- এতদিন তেমন গুরুত্ব দেই নেই তবে এইমুহুর্তে আপনি বলার জানার আগ্রহ জাগলো কেন এমন টা ঘটে?
    মুখের হাসির রেখা টা আর ও বড় করে একদম মানবিকার কাছে দাঁড়িয়ে তার ডান হাতের তর্জনী দিয়ে একটা দিক নির্দেশ করলো।মানবিকা সেইদিক লক্ষ্য করতে গিয়ে দেখলো তার চোখকে ইশারা করছে ইহসান।
    মানবিকা কিছু বুঝতে না পেরে অবাক হয়ে ইহসানের দিকে তাকিয়ে থাকে।হঠাৎ ই ইহসান মানবিকার কাছ থেকে ছিটকে সরে কম্পিউটার এর সামনে চলে আসে।এতে মানবিকা ভীষন অপমানবোধ করে। তাই সে ফাইল নিয়ে চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়ায়। দরজার কাছে আসার পর পিছন থেকে ইহসান ডাকে- মানবি?
    ইহসানের ডাক শুনে পিছনে ফিরে তাকিয়ে দেখে সে এখন রকিং চেয়ারের কাছে।
    -তোমার চোখগুলো একদম ওসারিসার মত।যখন ও জীবিত ছিলো তখন হুবহু এইরকম ই দেখতে ছিল।তাই তোমার ওই চোখ গুলো আমার চাই।তাই তুমি সবার থেকে আলাদা।

দরজা থেকে বের হয়ে আর পা চালিয়ে হাটতে পারছে না মানবিকা।ইহসানের কাছে ও সবার থেকে আলাদা সেটা জানার পর ওর খুশি হওয়ার কথা কিন্তু ও খুশি হতে পারছে না। ও মনে করার চেষ্টা করে ইহসান কি বলেছিলো – ওর চোখ ওসারিসার মত।সে জীবিতকালে তার মতো চোখ
ছিলো।তবে কি সে মৃত?কিন্তু তা কি করে হতে পারে?ওসারিসা ত ম্যাডামের নাম যে সবসময় ওই ঘরে রকিং চেয়ারে বসে থাকে।ইহসানের বউ।
আর কিছু ভাবতে পারছে না মানবিকা।বাড়ি ফিরতে হবে তাকে।


-আমার কাছে সব কিছু কেমন গোলমেলে লাগছে।
-কিরকম?
-তুমি যা করতে চাইছো তা কি ঠিক হবে?স্যার এর অগোচরে তার সম্পকে অনুসন্ধান করা হবে এটা স্যার জানতে পারলে আমার কি অবস্থা করবে বুঝতে পারছো?
-তুমি কি তোমার চাকরী চলে যাবে ভেবে ভয় পাচ্ছো নাকি তোমার সম্পকে ইহসানের সামনে খারাপ কিছু ধারনা আসবে ভেবে ভয় পাচ্ছো?(ভ্রু নাচিয়ে প্রশ্ন করলো রুনিত)
রুনিতের কথায় ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে মানবিকা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে তার দিকে তাকিয়ে বলল -বেশ তুমি যা করতে চাইছো তাই ই হবে।তবে সাবধান কেউ যেন কিছু জানতে না পারে।
-ওকে ম্যাডাম,আপনি শুধু আমাকে ইহসানের রুমে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করে দিন বাকিটা আমি সামলে নিবো,বলেই মানবিকার দিকে তাকিয়ে একচোখ টিপ মারলো।মানবিকা তার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে নিজেকে শান্ত করে জবাব দিলো- অফিসের সবাইকে বলবো যে আপনি আমাদের কোম্পানিতে একজন অফিস সহকারী হিসেবে জয়েন হতে চান তাই স্যারের সাথে দেখা করতে যাচ্ছেন,কারন সকলের সামনেই নিয়ে যেতে হবে আর সবাই এমনি ই আমাকে নিয়ে কানাঘুষা করে।
শেষের কথায় যে কিছুটা হতাশা রয়েছে সেটা বুঝতে পেরে রুনিত বলল- চিন্তা করবেন না। আমি আমার কাজ শেষ করার আগ পর্যন্ত কোনো ঝামেলা করবো না আর আপনাকে ও কোনো বিপদে পড়তে দিবো না।
রুনিতের কথা শুনে তার দিকে কিচ্ছুক্ষন একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে মানবিকা সামনে দরজার দিকে হাটতে শুরু করে।দরজার কাছে এসে পিছন ফিরে ইশারায় রুনিতকে ও তাকে অনুসরণ করতে বললে,সে একবার ডানহাত দিয়ে কান চুলকে একটা দুষ্টুমি হাসি দিয়ে তার পিছে পিছে হাটতে আরম্ভ করলো।
রুনিত পেশায় একজন সাংবাদিক।তার কাজে খুশি হয়ে তার বস তাকে এইকাজের দায়িত্ব দেয়।আজ থেকে প্রায় ১০ বছর আগে এই শাড়ির কোম্পানি ছিলই না কিন্তু মাত্র ১০ বছরে কোম্পানি তৈরী হয়ে সেরা দশের তালিকায় কিভাবে এসেছে সেটাই বেশিরভাগ মানুষের কৌতুহল।আর সেই কৌতুহল থেকেই আজ এইখানে অনুসন্ধান করতে এসেছে এই রহস্য।কিন্তু জন্মের রহস্য খুজতে গিয়ে যে মৃত্যুর রহস্য বেরিয়ে আসবে সেটা রুনিত ভাবেই নি।বিগত ৩ বছরে ওই কোম্পানির আনুমানিক ২/৩ জন কর্মচারী নিখোজ হয়ে যায়।তাদের খোজ আর কখনই পাওয়া যায় নি।কি হয়েছিলো তাদের সাথে?তারা কি আদৌ জীবিত?তাই কিছুটা কৌতুহলের কারনেই এই কাজ টা করতে রাজি হয়। জানতে চায় “ওয়াসান ক্লথস হাউজের ” লুকানো রহস্য।


মানবিকা দরজায় কয়েকবার নক করার পর ও যখন কেউ দরজা খোলে না তখন সে নিজেই দরজার হাতল ঘুরালো।ঘরে ঢুকে প্রতিবারের মতই সেই কেমিক্যাল আর মাটির গন্ধ।ভাল মত লক্ষ্য করে দেখলো ঘরে কেউ নেই।একজন ছাড়া।ওসারিসা ম্যাডাম।ঠিক একই ভঙ্গিতে সে বসে আছে রকিং চেয়ারে পিছন ফিরে।তবে চেয়ারের হাতলে রাখা ডানহাত টা দেখা যাচ্ছে।মানবিকা বলল- ম্যাডাম,স্যার কোথায়?একজন ক্লায়েন্ট এসেছে কিছু জরুরি দরকারে।
কিন্তু অপরপাশ থেকে কোনো উত্তর এলো না।একটু নড়তে ও দেখা গেলো না সেই চেয়ারটাকে।সবসময় যেমন স্থির আজ ও ঠিক তাই।আস্তে আস্তে করে এগিয়ে গেলো মানবিকা।টেবিলের সামনে এসে আবার ডাক দিলো – ম্যাডাম?আর ইউ ওকে?
কিন্তু তারপর ও কোনো প্রতিউত্তর নেই।তাই বাধ্য হয়ে মানবিকা হাত বাড়াতে শুরু করলো চেয়ারের দিকে।চেয়ারের উপরে কাপা কাপা হাত রেখে অজানা কিছু আশংকায় একটা বড় নিঃশ্বাস নিয়ে হাতের উপর জোরে চাপ দিয়ে চেয়ারটা ঘুরিয়ে দিলো।চেয়ারের বসে থাকা ব্যক্তিকে দেখে ভয়ে মানবিকা যেই চিৎকার করতে যাবে তখন ই কেউ তার মুখ চেপে ধরলো।সামনে তাকিয়ে দেখলো রুনিত।সে নিজে ও যে বেশ ভয় পেয়েছে সেটা তার কপাল বেয়ে গড়িয়ে পড়া ঘাম দেখে বুঝে নিলো মানবিকা।একহাতে মানবিকাকে জড়িয়ে ধরে সামনে বসে থাকা নারীকে দেখছে রুনিত।কি ভয়ংকর।না ভয়ংকর নয় বরং অদ্ভুদ।সম্পূর্ণ শরীর ঠিক আছে কেবলমাত্র চোখ নেই। চোখের জায়গা ফাকা।ফাকা জায়গা দিয়ে লাল রঙের কিছু একটা দেখা যাচ্ছে।সেটা কি বুঝতে পেরে বমি এসে গেলো রুনিতের।কিন্তু বেশিক্ষন তাকিয়ে থাকতে পারলো না।সামনের চেয়ারে মানবিকাকে বসিয়ে রেখে মুর্তির দিকে এগিয়ে যেত লাগলো।যতই আগাচ্ছে ততই গন্ধটা আর ও কড়া হয়ে উঠছে।মুর্তির কাছে এসে নিচু হয়ে সেটা দেখতে গিয়ে খেয়াল করলো একদম হুবহু মানুষ।কিন্তু শরীরে কোনো সার নেই।এইরকম একটা বীভৎস মুর্তি কেন রেখেছে তা কিছুতেই বুঝতে পারলো না।মুর্তি খেয়াল করতে গিয়ে দেখতে পেলো ড্রয়ার হালকা খোলা।সেটা টান দিয়ে খুলে দেখলো কিছু কাগজ,কলম আর একদম কোনে একটা ফ্রেম উল্টো করে রাখা।ডানহাত বাড়িয়ে ফটোফ্রেম উলটে যা দেখলো তাতে সে মুর্তির থেকে কিছুটা দূরে সরে গেলো।এইবার আস্তে আস্তে আবার মুর্তির সাথে ফটোটে থাকা ব্যক্তির চেহারা মিলাতে গিয়ে যা আবিষ্কার করে তাতে রীতিমতো ভয় পেয়ে যায় সে।এবং মুর্তির থেকে যে কেমিক্যাল এর গন্ধ আসছে তার ভিতর থেকে একটা গন্ধ চিনতে পারে।গবেষনাগারে থাকা অবস্থায় এই গন্ধের সাথে পরিচিত হয়েছিল যখন মাধ্যমিকে ছিলো।আর সেটা হলো বোরাক্স পাউডার বা সোডিয়াম রোবট।এইবার রুনিত বুঝতে পারে এই অদ্ভুদদর্শিত ম্যানিকুইনের রহস্য।
এতক্ষনে নিজেকে সামলে নিয়ে রুনিতের দিকে ফিরলো মানবিকা।প্রশ্ন করলো – কি দেখছো এইভাবে?
-তোমরা কখনও ম্যাডামকে দেখেছো?
-না। ম্যাডাম সবসময় ওই চেয়ারে বসে থাকে।স্যার বলতো ম্যাডাম কথা বলতে পছন্দ করে না বলে কারো সাথে কথা বলতো না।আর আমাদের ও কড়া নির্দেশ ছিলো যেন কখনও তাকে বিরক্ত না করি।কিন্তু আজকে স্যার কেন ম্যাডামের জায়গায় এই মুর্তি রেখেছে বুঝতে পারছি না।
-চেয়ারে সবসময় যে বসে থাকে আজ ও সেই বসে আছে মানবিকা।শুধু এতদিন থাকতো পিছন ফিরে আর আজ সামনে ফিরে।
রুনিতের কথা বুঝতে না পেরে কপাল কুচকে তাকে প্রশ্ন করলো -মানে?কি বলতে চাইছো?
মানবিকার প্রশ্নে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে তার দিকে এগিয়ে গিয়ে হাত ধরে টেনে আবার মুর্তির সামনে দাড় করালো।বলল- এইখানে পার্থক্য কি খুজে বের করতো।
ভাল করে মুর্তিটাকে দেখে এবং ছুয়ে বলল- ‘একজন অসাড় চোখবিহীন নারী।’
-একদম ঠিক।এইবার এই ছবির সাথে কোনো মিল আছে নাকি দেখো।
ছবির দিকে তাকিয়ে চমকে উঠলো। একদম ছবির ভিতরের মানুষটিই চেয়ারে বসে আছে।শুধুমাত্র ছবিতে চোখ আছে আর এইখানে চোখ নেই।ছবির পাশেই দাঁড়িয়ে আছে ইহসান।তবে কিছুটা যুবক দেখাচ্ছে তাকে।এই ছবির মাধ্যমেই বুঝা যাচ্ছে ইহসানের পাশে যে আছে সেই ওসারিসা।তার মানে…
রুনিতের দিকে তাকালে সে চোখের ইশারায় বলে যে হ্যা যা ভেবেছো সেটাই।
-মারা গেছে ওসারিসা।ইহসান এখন শুধু ট্যাক্সিডার্মির মাধ্যমে জীবন্ত ম্যানিকুইন করে রেখেছে।
ওসারিসা মৃত। এটা জানার পর থেকে মানবিকার মনে খুশির জোয়ার উঠছে।ইহসানকে সে পেতে পারে।একটু সময় দিলে হয়ত ইহসান তাকে গ্রহন করবে।কিন্তু রুনিতের কথা শুনে তার দিকে ফিরে এই কথার মানে জানতে চাইলে রুনিত বলে -“মৃত প্রানীর শরীরকে(প্রধানত চামড়াকে) কেমিক্যাল ও ট্যানিংয়ের মাধ্যমে সংরক্ষন প্রক্রিয়া ও তাকে জীবন্তের ন্যায় দেখানোর উপায়কেই ট্যাক্সিডার্মি বলে।” অর্থাৎ ইহসান একজন ট্যাক্সিডার্মিস্ট।

  • তুমি এসব কি করে জানলে?
  • কারন, মুর্তির পাশে দাঁড়িয়ে আমি বোরাক্স পাউডার বা সোডিয়াম রোবটের গন্ধ পেয়েছি।যা ট্যাক্সিডার্মি প্রক্রিয়ায় চামড়া সংরক্ষনে ব্যবহার করা হয়।
    নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছে না মানবিকা।এসব কি? ওসারিসাকে কেন ম্যানিকুইন বানিয়ে রেখেছে?তার ভাবনায় ছেদ ঘটলো পায়ের আওয়াজে।কেউ এইদিকেই আসছে।রুনিত চায় না এত তাড়াতাড়ি তাকে কেউ দেখে ফেলুক তাই সে মানবিকাকে শান্ত এবং স্বাভাবিক থাকতে বলে আড়ালে লুকিয়ে গেলো।

ইহসান ঘরে ঢুকে দেখে শাড়ির সামনে মানবিকা দাঁড়িয়ে শাড়ি দেখছে।হাতে একটা ফাইল।কাপা হাতে ধরে দাঁড়িয়ে আছে।মেয়েটা তার কাছে আসলে এত কাপে কেন?যাই হোক,আজই তার কাপাকাপি সব শেষ হয়ে যাবে ভেবেই একটা রহস্যময় হাসি হাসলো।
মানবিকা স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করলে ও কিছুতেই থাকতে পারছে না।অন্তত একজন মৃতব্যক্তির সাথে বসবাসকারীর সামনে শান্ত থাকা অসম্ভব।তার ফলে,হাত কাঁপছে, পা কাঁপছে, ঘন ঘন নিঃশ্বাস পড়ছে।শরীরের উপর গরম ভাব লাগায় বুঝতে পারলো ইহসান তার পাশে এসে দাড়িয়েছে।তাকে দেখে চমকে যাওয়ার ভান করলো।কে জানে ঠিকমত অভিনয় করতে পেরেছে নাকি…
মুখে সামান্য হাসি নিয়ে প্যান্টের পকেটে হাত ঢুকিয়ে তার দিকে তাকিয়ে আছে ইহসান।মনের ভিতরে অশুভ অসুখটা আবার বেড়ে গেলো।না এই ব্যক্তি কিছুতেই খারাপ হতে পারে না।কিছুতেই না। কিন্তু মাথায় রুনিতের কথাগুলো মনে আসতেই নিজেকে সামলে নিয়ে ভাঙ্গা ভাঙ্গা গলায় বলল- সরি স্যার,আপনি যে রুমে নেই তা আমি জানতাম না।এই ফাইল সিগনেচার করতে হবে আর… আর একজন ক্লায়েন্ট আপনার সাথে দেখা করতে এসেছে আমি তাকে…..
-উহহু,থামো তো।কেন মিথ্যে বলছো?
ইহসানের কথা শুনে দম বন্ধ হওয়ার অবস্থা মানবিকার।তবুও প্রশ্ন করলো -কি মিথ্যে?
মানবিকাকে একপলক দেখে নিয়ে তার একদম কাছে গিয়ে কানের কাছে মুখ নিয়ে বলল- এই শাড়ি টা তোমার পছন্দ হয়েছে তাই না?এই শাড়ির মোহে তুমি আটকে পড়েছিলে,তাই তো আমি যে ঘরে প্রবেশ করেছি তা তুমি টের ও পাওনি।আসলে এই শাড়িটাই এমন।যে একবার দেখে সে এটার প্রেমে না পড়ে থাকতেই পারবে না।একটা বিশেষদিনের জন্য এই শাড়িটা তৈরী করেছি আমি নিজে।
ইহসানের কথায় কিছুটা নিশ্চিত হয়ে তার দিকে তাকিয়ে বলল- সত্যিই আপনার হাতে জাদু আছে।ভীষন সুন্দর এটা। এনিওয়ে,উনি অনেকক্ষন অপেক্ষা করছে তাকে ডেকে নিয়ে আসি।বলেই ফাইল রেখে দ্রুত ঘর থেকে বের হতে নিলে পিছন থেকে ইহসান বলে উঠে – অভিনয় টা তুমি আমি দুজনই ভাল করতে পারি তাই না?
চমকে উঠে ভয়ে ভয়ে পিছন ফিরে তাকালে দেখতে ইহসান তার দিকে এগিয়ে আসছে।এইপ্রথম তার ভীষন ভয় করছে এইমানুষ টাকে।ইহসান কাছে এসে বলল- জানতে চাইলে না যে কোন বিশেষদিনের জন্য শাড়িটা তৈরী।বেশ আমি ই বলছি।ওসারিসার জীবিত হওয়ার দিন।বলেই জোরে জোরে হাসতে লাগলো।কি ভয়ংকর সেই হাসির প্রতিধ্বনি। কানে তালা লেগে যাওয়ার মত।হঠাৎই হাসি থামিয়ে একহাত দিয়ে মানবিকাকে ধরে টেবিলের সামনে এনে বলে – আমাকে বোকা ভেবেছো?আমার ঘরেই, আমার উপর দিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছো।ঠিক মত কাজটা ও করতে পারোনি। এই দেখো,আমার লুকিয়ে রাখা ফ্রেম বের করে দেখে নিয়েছো তুমি সব কিছু। এখন আর তোমাকে বাচিয়ে রাখা যাবে না।
ভেবেছিলাম,শুধু প্রয়োজনটুকুই মিটলেই ছেড়ে দিবো তোমাকে। কিন্তু তুমি ত নিজের প্রতি মায়া করলে না তাই আমাকেই ব্যবস্থা করতে হবে।

  • প্লিজ, আমাকে ছেড়ে দিন স্যার।আমি কিছু জানি না।কিছু দেখি নি।আমার পরিবার আছে।(কাঁদো কাঁদো গলায় বলল মানবিকা)
  • পরিবারের কথা চিন্তা করতে হতো না যদি বেশি চালাকি না করতে। তবে তুমি আমার এত বড় সাহায্য করছো তার বিনিময়ে ত আমাকে কিছু দিতে হয়।তাই পরিবারের কথা চিন্তা করতে হবে না।সেই দায়িত্ব আমার।(বলেই সব দাত বের করে হাসতে লাগলো)
    মানবিকার বাম হাত খুব শক্ত করে ধরে রেখেছে ইহসান।সে জানে মানবিকা লেফটহ্যান্ড ছাড়া কোনো কিছুই করতে পারে না।তাই তার আক্রমন করার ও কোনো সম্ভবনা নেই।মানবিকা নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়া আপ্রান চেষ্টা করেও ব্যর্থ হচ্ছে।ব্যর্থ হয়েছে সে নিজের মনের কাছে।ইহসান তার পকেট থেকে একটা ইনজেকশন বের করে সেটার সুচের দিকে তাকিয়ে থাকে।
    -এই চোখ দুটি পেলেই আমার ওসারিসা আবার জেগে উঠবে।আমার উপর দয়া করো। শান্ত হয়ে যাও মানবি।তোমার কথা আমি সারাজীবন মনে রাখবো। কিন্তু ওসারিসাকে বেচে ফিরতে হবে দুনিয়ায়।আমার জন্য।তাই তোমার চোখ দুটো আমার দিয়ে দাও।
    -না, ইহসান।আমার সাথে এটা করতে পারো না। প্লিজ আমাকে যেতে দাও।আমি এইশহর থেকে অনেক অনেক দূরে চলে যাবো।
    একটু একটু করে ইনজেকশনটা এগিয়ে আসছে মানবিকার চোখ লক্ষ্য করে। সেদিকে তাকিয়ে থাকতে না পেরে চোখ বন্ধ করে নিলো।কিন্তু ইহসানের চিৎকারের চোখ খুলে দেখলো রুনিত ইহসানের হাত চেপে ধরেছে।নিজের হাতের উপর চাপ পড়ায় মানবিকার হাত ছেড়ে দিলো ইহসান।মানবিকা ছাড়া পেয়ে দূরে সরে গেলে রুনিত পিছন ফিরে মানবিকার উদ্দেশ্য বলে – এখুনি বাইরে যাও।আর পুলিশকে খবর দাও।
  • না না।মানবি আমার সাথে এটা করতে পারো না।তুমি ত ভালবাসো আমাকে। তবে কি করে আমার ক্ষতি করতে পারো তুমি?
    মানবিকা দ্বিধায় পড়ে যায়।হঠাৎ ই লক্ষ্য করে ইহসান তার বাম হাত দিয়ে পকেট থেকে একটা ছুরি বের করছে।আর সেটা দিয়ে যে রুনিত কে আঘাত করবে বুঝতে পেরে দৌড়ে এসে ছুরিটা ফেলে দিতে চায়।দুইহাতের উপর ই চাপ সৃষ্টি হওয়ার নিজেকে ঠিকমত দাড় করিয়ে রাখতে পারছে না ইহসান। তাই কিছুটা টলতে টলতে পিছিয়ে গেলো।দেয়ালের সাথে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে কিছুটা দেয়ালের উপর ভর দিয়ে ইনজেকশন যে হাতে সেই হাতের উপর চাপ দিয়ে রুনিতের চোখ বরাবর তাক করে সামনে নেওয়ার চেষ্টা করতে লাগল।নিজেকে বাচানোর জন্য অসাবধানতায় রুনিত তার দুইহাত দিয়ে ইনজেকশন ফেলে দিতে চাইলে সেটা ছিটকে ইহসানের অক্ষিগোলক এ ঢুকে যায়।ইহসানের গগন কাপানো চিৎকারে মনে হলো আকাশে সমস্ত পাখি উড়ে পালিয়ে গেলো।এইরুম সাউন্ডপ্রুফ হওয়ার কারনে সেই চিৎকার বাহিরের কেউ শুনতে পায় নি।হয়ত পেয়েছে।নিজের ভুল বুঝতে পেরে রুনিত দু’পা পিছিয়ে গেলে তাকে স্বান্তনা দিতে মানবিকা এগিয়ে এলো।রুনিত এতটাই ভেঙ্গে পড়েছে যে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারছে না।একসময় ইহসানের ছটফটানি থেমে যায়।ওরা বুঝতে পারে মৃত্যু হয়েছে ইহসানের।কিন্তু তার জন্য রুনিত নিজেকে দোষী ভাবতে শুরু করলো।ইহসানের এই পরিনতির জন্য মানবিকার একটু ও কষ্ট হচ্ছে না বরং একটা পাগলের হাত থেকে মুক্তি পেয়েছে ভেবে শান্তি পাচ্ছে।কিন্তু এইমুহুতে এইখান থেকে পালিয়ে যেতে হবে না হয় রুনিত আর সে ফেসে যেতে পারে।হাজার হোক আজ রুনিতের জন্যই সে বেচে আছে।তাই রুনিত কে উঠিয়ে এক হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরে এগিয়ে যেতে লাগলো দরজার কাছে।হঠাৎ ই পিছন থেকে একটা আওয়াজ ভেসে আসতে লাগলো।কিছুটা গাঢ় নিঃশ্বাসের শব্দ।শরীরের আড়মোড় ভাঙ্গার শব্দ।যেন কেউ ঘুম থেকে উঠেছে।শব্দের উৎস জানার জন্য পিছন ফিরতেই দুজনের চোখ কপালে উঠে গেলো।ভয়ে মানবিকা পড়ে যেতে নিলে রুনিত তাকে ধরে দাঁড়িয়ে থাকে।দু’জনের মুখে কোনো কথা নি।স্বয়ং ওসারিসা বসে আছে চেয়ারে।একদম সুস্থ।চোখের থেকে জ্যোতি একদম ঠিকরে বেরোচ্ছে।সোজা লম্বা চুল গুলো উড়ছে।কিন্তু কোথাও বিন্দুমাত্র বাতাস নেই।তাদের দিকে তাকিয়ে মুখে মুচকি হাসি মেখে বসে আছে।
  • না এটা হতে পারে না।মৃত ব্যক্তি জেগে কি করে উঠলো?
    মানবিকার প্রশ্নে রুনিতের কিছু একটা মনে পড়ায় সে বলে উঠলো -‘ মাই গড,এটা কিভাবে সম্ভব হলো।মনে আছে ইহসান কি বলেছিলো – শুধুমাত্র তোমার চোখ পেলেই ওসারিসা আবার জেগে উঠবে।অর্থাৎ, ওসারিসার বেচে উঠার জন্য কেবল চোখের প্রয়োজন ছিলো তাই ওর মুর্তিতে তখন চোখ ছিলো না। ইহসান চেয়েছিল ওসারিসা যেন একদম আগের মতই থাকে কোনো পরিবর্তন যেন না আসে তাই ও তোমার চোখ বেছে নিয়েছিলো কারন তোমাদের দুজনের চোখ একই।কিন্তু ভাগ্যের কারনে ওসারিসা চোখ পেয়ে যায় কারন ইহসানের চোখ বেরিয়ে ওসারিসার চোখের গর্তে ঢুকে যায়। আর সে আবার জীবিত হয়ে উঠে। আর এখন সে ইহসানের চোখ দিয়ে আমাদের দেখছে।আমরা তার শত্রু।চলো পালাও।
  • দাড়াও।ভয় পেও না।
    একটা শান্ত,স্নিগ্ধ গলার স্বর শুনে থমকে যায় রুনিত।রুনিতের থেমে যাওয়া দেখে তার দিকে তাকিয়ে আছে মানবিকা।রুনিত পিছনে ফিরে তাকালে দেখতে পায় ওসারিসা চেয়ার ছেড়ে উঠে দাড়িয়েছে।নিঃসন্দেহে ওসারিসা সুন্দরী।কেন ইহসান ওসারিসাকে বাঁচিয়ে রাখতে চেয়েছিলো সেটা বুঝতে পারছে রুনিত।রুনিত মোহগ্রস্ত হয়ে একপা একপা করে এগিয়ে যাচ্ছে ওসারিসার কাছে।পিছন থেকে মানবিকা বার বার ডেকে ও তাকে ফিরাতে পারেনি।শেষে রুনিতের হাত ধরে টান দিলে সে হুশে ফিরে এসে একজন আরেকজনকে জড়িয়ে ধরে রাখে।সেদিকে তাকিয়ে হালকা শব্দ করে হেসে ওসারিসা বলে – ‘দশ বছর পর এই চেয়ার থেকে উঠে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পেরে আমি খুবই আনন্দিত।একমাত্র তোমাদের জন্যই আমি আবার জেগে উঠেছি।মৃত্যুর পর আবার বেচে উঠতে কিন্তু দারুন লাগে।আমি তোমাদের কোনো ক্ষতি করবো না। আমি এখন মুক্ত।এই পৃথিবীর প্রতিটি জায়গা আমি এখন বিচরন করতে পারবো।’
    এই কথা বলে ওসারিসা একটু একটু করে এগিয়ে আসতে শুরু করলো। একবার ইহসানের মৃত দেহের দিকে তাকিয়ে বলল- ‘এই জন্মে ও চেয়েছিলাম তুমি আমার পাশে থাকবে কিন্তু তা সম্ভব হয়নি তবে তোমার জন্য যে আমি বেচে ফিরেছি তার জন্য তোমাকে সারাজীবন মনে থাকবে আমার ইহসান।আমি যেখানেই থাকি না তোমার চোখ দিয়েই আমি পৃথিবী দেখবো। তাই কষ্ট পেয়ো না।’
    এগিয়ে আসতে আসতে একসময় মানবিকাদের পার করে দরজার সামনে চলে এসেছে।পিছন ফিরে মানবিকার উদ্দেশ্য বলল- ওই শাড়িটা তোমাকে উপহার দিয়ে গেলাম।একটা বিশেষদিনের জন্য তৈরী হলেও সেটা আর সম্ভব না তাই ওইটা কে আমি নিজের সাথে করে নিয়ে যেতে পারলাম না।
    দরজা খুলে গেলো।বেরিয়ে গেলো ওসারিসা।আর সেদিকে তাকিয়ে রইলো মানবিকা আর রুনিত। ওসারিসার চলে যাওয়ার সাথে সাথে কমতে শুরু করলো কেমিক্যাল এর গন্ধ।কিন্তু বাড়তে লাগলো রক্তের গন্ধ।ইহসানের রক্ত।ওসারিসা কোনো ক্ষতি না করে চলে যাওয়াতে হাফ ছেড়ে বাচলো মানবিকা।রুনিতকে ছেড়ে পাশে সরে দাঁড়ালো। রুনিত একবার ইহসানের লাশের দিকে তাকিয়ে এগিয়ে গেলো দরজার দিকে। বেরিয়ে পড়তে হবে তাদের যতদ্রুত সম্ভব।কিন্তু দরজার হাতলে হাত রেখে মোড় দিতেই বুঝতে পারলো মস্ত বড় ভুল হয়ে গেছে।রুনিতের থেমে যাওয়া দেখে মানবিকা প্রশ্ন করলো – কি হয়েছে?
  • দরজা লক করা।আমরা আর বেরোতে পারবো না।ওসারিসা আমাদের বন্দি করে চলে গেছে।
    রুনিতের অসহায় কন্ঠ শুনে বুক কেপে উঠলো মানবিকার।সে বলল – ওসারিসা ত বলেছে আমাদের কোনো ক্ষতি করবে না তবে এটা কেন করলো?
    -ওসারিসাকে কি উপায় জীবিত করতে চেয়েছিলো তা আমাদের জানা নেই।আর তাছাড়া ওসারিসাকে একদম ওসারিসার মত হওয়ার জন্য তোমার চোখের প্রয়োজন ছিলো। কিন্তু ও সেটা পায় নি আমার জন্য। তাই ওর আমার উপর রাগ।আর তাছাড়া ইহসান মারা গেছে।ওসারিসা চেয়েছিলো বেচে উঠার পর ও যেন ইহসান ওর পাশে থাকে সেটা ও সম্ভব হয়নি।আর তুমি ইহসানের প্রতি দূর্বল ছিলে। যার জন্য ওসারিসা তোমাকে ঘৃণা করে।ও শুধুমাত্র এইখান থেকে বেরোতে ভাল ভাল কথা বলে আমাদের বোকা বানিয়ে গেছে।আমরা এখন আর বেরোতে পারবো না।
    নিজেদের অসহায়ত্ব বুঝতে পেরে মানবিকা মাটিতে বসে কেদেই ফেললো।তাকে স্বান্তনা দিতে রুনিত এগিয়ে আসতেই একটা পোড়া পোড়া গন্ধ তার নাকে লাগে।চারদিকে তাকিয়ে কিসের গন্ধ খুজতেই দেখতে পায় দরজার ফাক দিয়ে ধোয়া উড়ছে।আর বুঝতে বাকি রইলো না কিসের গন্ধ।দৌড়ে মানবিকার কাছে এসে তাকে জড়িয়ে ধরলো।তাদের মৃত্যু নিশ্চিত। আর তারা এই ঘরের বাহিরে যেতে পারবে না।যে ঘরের এতবছর ধরে ওসারিসা ছিলো আজ থেকে সারাজীবনের জন্য সমাধি হয়ে থাকবে তারা।সে,মানবিকা আর ইহসান।চোখ বন্ধ করে আর ও জোরে জড়িয়ে ধরলো মানবিকাকে।ইতিমধ্যেই আগুন এইরুম ছুয়ে ফেলেছে।তারপর ই সব শেষ।পুড়ে ছাই হয়ে বাতাসে উড়বে সবকিছু!!!

জঙলের পাশে দাঁড়িয়ে আছে ওসারিসা। দৃষ্টি ‘ওয়াসান ক্লথ হাউস’এর দিকে।পুরো বিল্ডিং দাউদাউ করে জ্বলছে।সেদিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।তারপর চোখ উঠিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল – ‘বিদায় ইহসান! তোমার হয়ে প্রতিশোধ আমি নিয়েছি।তোমার আত্মা এইবার শান্তি পাবে।ফিরে এসো তুমি আবার কোনো উপায়ে।আমি অপেক্ষায় থাকবো তোমার।’
কথা শেষ হতেই টপ করে দু’ফোটা পানি গড়িয়ে পড়লো ওসারিসার চোখ দিয়ে।


-আজ আপনার প্রেসের সাথে মিটিং আছে ম্যাডাম।সকলের মনে একটা ই প্রশ্ন মাত্র একবছরের মধ্যে কিভাবে আপনি এই পরিত্যক্ত বাড়িকে শহরের একনাম্বার শাড়ির শোরুম তৈরী করেছেন।
প্রশ্ন শুনে মুচকি হেসে জবাব দিলো – “সব প্রশ্নের উত্তর জানতে নেই।পরে উত্তর বিশ্বাস না হলে প্রশ্নকর্তাই অপমান।”
-ম্যাডাম তবে কি চলে যেতে বলবো?

  • না।আমি যাবো।
    ব্যক্তিটি ঘরে থেকে চলে যেতেই চেয়ার থেকে উঠে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে একবার দেখে জোরে জোরেই বলতে লাগলো -“আমি ওসারিসা।মৃত্যু ও যাকে আটকে রাখতে পারেনি।এই প্রকৃতির সব নিয়ম ভঙ্গ করেছি আমি।এই কোম্পানি আমার।যা আমার স্বামী এবং তার হত্যাকারীদের পোড়া ছাইয়ের উপর নির্মিত করেছি।”

——–সমাপ্ত———
[“”গল্পে উল্লেখিত ট্যাক্সিডার্মি কোনো কল্পনা থেকে আনা হয়নি।১৭৪৮ সালে ফ্রান্সের রিয়াউমুর পাখির দেহ সংরক্ষনের মাধ্যমে প্রথম ট্যাক্সিডার্মি আবিভার্ব হয়।ট্যাক্সিডার্মির স্বর্ণযুগ বলা হয় ভিক্টোরিয়ান যুগকে।সাধারনত ট্যাক্সিডার্মি প্রক্রিয়ার চামড়া সংরক্ষনের এর চোখের জন্য চিনামাটি ব্যবহার করা হয়।যদি ও গল্পের স্বার্থে এইখানে তা বিকৃত করে মানুষের চোখ লেখা হয়েছে।তবে এই প্রক্রিয়ায় কেবল বস্তুটিকে জীবন্তের মত মনে হয় কখনো জীবন্ত হতে পারে না।আমরা মুসলিম রা বিশ্বাস করি আমাদের জীবন একটাই।মৃত্যুর পর আর কখনই ফিরে আসা সম্ভব নয়।’ লা পাসকুয়ালিটা ‘ নামক এক ম্যানিকুইন রয়েছে যা দেখতে হুবহু একদম মানুষের মত।ইন্টারনেটে এই সম্পকে আর ও অনেক তথ্য পাওয়া যাবে।হয়ত এই গল্পে কোথাও ঠিকমত ট্যাক্সিডার্মি কে ফুটিয়ে তুলতে পারিনি।তাই আশা করবো,গল্পে বিশ্বাসী না হয় একটু রিসার্চ করে আসল ট্যাক্সিডার্মি সম্পকে জ্ঞান আহরন করবেন।ধন্যবাদ!!””]

By admin

Related Post

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *